cow feed import

 ২০১৮ সালের প্রথমদিকের কথা।

এক ঘনিষ্ঠ সুহৃদ বন্ধু গরুকে ভাংগা গমের গুড়া খাওয়াইতে দেখে আমাকে প্রস্তাব দিলো আসেন আমরা কয়েকজন মিলে গমের ভুষি আমদানী করি, নিজেদের গরুকে খাওয়াতে পারবো সাথে কম দামে বাইরেও কিছু বিক্রি করতে পারবো। আমি রাজী হলাম৷ কিন্তু আমদানী করা তো সহজ কাজ না। এক দ্বীনদার খামারী ভাইকে খুজে পেলাম যিনি বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন পন্য আমদানী রপ্তানির সাথে জড়িত। আমি অর্থসংকটের কারনে শুরুতে প্রত্যক্ষ জড়িত না থাকলেও পুরা প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত ছিলাম। তারা প্রথমে দুবাই থাকা তাদের এক আমদানীকারক বন্ধুর মাধ্যমে ইউক্রেন থেকে এক চালান আনার চেষ্টা করলো। কলম্বো থেকে সেই চালান ফেরত গেলো। গমের ভুষির মূল্য ইউক্রেনে সবচেয়ে কম হলেও আমাদের মতো চুনোপুটির দ্বারা ইউক্রেন থেকে পন্য আমদানী সম্ভব না। কারন ইউক্রেনের সাথে আমাদের ব্যাংকের বিজনেস রিলেশন নাই। সিংগাপুর সোর্স কান্ট্রি দেখায়ে ইউক্রেন থেকে আমদানী করতে হয়। যা বড় কোম্পানীর দ্বারা শুধুমাত্র সম্ভব।
ইউক্রেন ফেইল করায় বিকল্প উৎস থেকে দ্বিতীয় চেষ্টা শুরু হলো। ডি এল এস, ব্যাংক সহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থায় দেখা গেলো ছোট আমদানীকারকদের কোন প্রকার সাহায্য করা হয়না। বরং বড় কোম্পানীর কাছে সব তথ্য চলে যায় এবং প্রতি পদে পদে বাধাপ্রাপ্ত হতে হয়। দ্বিতীয় চেষ্টায় সকল বাধা অতিক্রম করার পরে পোর্ট থেকে পন্য খালাসের সময় দেখা গেলো, প্রয়োজনীয় রিপোর্ট গুলো যেখানে বড় কোম্পানী আলাউদ্দিনের চেরাগের কল্যানে অতি দ্রুত গতিতে পেয়ে যায়, সেখানে ক্ষুদ্র আমদানীকারকদের পেপার ফেলে রাখা হয়। পোর্টে কন্টেনারের মধ্যেই ফাংগাস ধরে ভুষি নষ্ট হতে বাধ্য করা হয়। তাই দ্বিতীয় চেষ্টায় আনা ভুষি কেজিতে ১ টাকা বাড়তি দামে পোর্টের মধ্যেই বিক্রি করে দেয়া হলো।
গত বছর আবার কয়েকজন বড় খামারীকে সাথে নিয়ে নিজেদের জন্য আমদানী করার উদ্যোগ নিলাম। এবার দেখলাম দেশ আরো এগিয়ে গেছে। নিওম করা হয়েছে আমদানীকারক সিন্ডিকেটের ছাড়পত্র ছাড়া কেউ গোখাদ্য আমদানী করার জন্য সরকারি কোন সংস্থার অনুমতি পাবেনা। আর অসম্ভব শর্তে ও অর্থের মাধ্যমে ঐ আমদানীকারক সিন্ডিকেটের সদস্য না হলে কেউ ছাড়পত্র পাবেনা। যেহেতু আমাদের এই সক্ষমতা নাই,সুতরাং এবার "শুরুতেই শেষ"।
এবার আসি গোখাদ্যের আমদানী মূল্য আর বাজার মূল্য নিয়ে। যে দামে গোখাদ্য আমদানী করা হয় আর যে দামে বাজারে বিক্রি হয়, সেই দামের মধ্যে এতটাই তফাৎ যে, ১০০ কোটি টাকার ভুষি আমদানী করলে সরকারকে একটা কেন ৩ টা করোনা হাসপাতাল আর ৫ টা প্রাডো গাড়ি উপহার দেয়া কোন কঠিন কাজ না। সরকারি সংস্থা হাতের মুঠোয় রাখা তো কোন ব্যাপার ই না।
এবার আসি রাখাল আর খামারী স্বার্থে। এদেশ এমন একটা দেশ যেখানে ভালো মানুষের অভাব নাই। কিন্তু ভালো মানুষকে ক্ষমতায় আর নীতিনির্ধারণী যায়গায় থাকতে বা বসতে দেয়া হয়না। কারন এই মানুষ গুলো নীতি নির্ধারনী যায়গায় বসে থাকলে অন্যায় করা খুব কঠিন হয়ে যায়, তাদের মাথা কেনা ও কঠিন হয়ে যায়। যার প্রমান আমরা দেখেছি এল. ডি. পি. প্রজেক্টের দূর্নীতির সংবাদ পড়ে। আমরা জানি শিক্ষক সম্প্রদায় খুব সৎ, কিন্তু তার হাতে কোটি টাকার দায়িত্ব দিয়ে কি দেখেছি, আসলেই সে কতোটা সৎ? কাজেই বর্তমান বাস্তবতায় সরকারের স্পষ্ট ও সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া উদীয়মান ও সম্ভাবনাময় পশুপালন খাত মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। আমাদের মতো চুনোপুঁটির ক্ষমতা নাই এদেশের সিস্টেম বদলে দেয়ার।
সবাই আমরা ভালো কথা বলি। কিন্তু যে যায় লংকা, সে হয়ে যায় রাবন। রাখাল ভাইদের বলছি, আসেন নিজের চিন্তা করি, বিদেশী গোখাদ্য পরিহার করে কচুরিপানা, কলমিলতা, সরিষাগাছ আর কলাগাছ সহ বিকল্প গোখাদ্য প্রক্রিয়াজাত করা শিখি, আমাদের বাপ দাদার মতো আমাদের দেশের আবহাওয়া ও খাদ্যের সাথে মানানসই গরু পালি, দেশী গরুর জাত উন্নয়ন করি, মোটা কাপড় আর মোটা ভাতের চিন্তা করি এবং কবির সাথে সুর মিলিয়ে বলি,
"সুখি হওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে বিবেকহীন হওয়া, বিবেক বিবশ হলেই বাচি।"

Comments